মেনু নির্বাচন করুন

মাছ ধরার দৃশ্য

নিশিন্দারা ইউনিয়ন, করতোয়া নদীর , শাখা নদীর তীরে বগুড়া সদর থেকে 5 কি. মি পশ্চিমে নুনগোলায় অবস্থিত। এই ইউপির চার পাশ বয়ে প্রায় অনেক খাল বিল বয়ে গেছে।

 

নির্বিচার নিধনে বিলুপ্ত হতে চলেছে দেশীয় প্রজাতির মাছ

ফজলুল হক রোমান নেত্রকোনা
১০ জুন ২০১৪, মঙ্গলবার, ১০:০০
 
নেত্রকোনা : নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে এভাবেই বিক্রি হচ্ছে ডিমওয়ালা মাছ : নয়া দিগন্ত
 
নেত্রকোনার বিস্তৃত হাওর, নদী-নালা, জলাশয়, খাল-বিলে দেশীয় প্রজাতির মাছ এখন হুমকির মুখে। মৎস্য শিকারিদের নির্বিচারে মৎস্য নিধনের ফলে বিলুপ্ত হতে চলেছে দেশীয় প্রজাতির মৎস্যভাণ্ডার। মৎস্য সংরক্ষণ আইনে মাছের প্রজননের এ মওসুমে ডিমওয়ালা মা ও রেণু পোনা ধরা এবং বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ থাকলেও কার্যকারিতার অভাবে নিধন হয়ে যাচ্ছে দেশীয় মৎস্য সম্পদ। ইতোমধ্যে দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
 নেত্রকোনার ঐহিহ্যবাহী ডিঙ্গাপুতাসহ অন্যান্য হাওর, বিভিন্ন মৎস্য অভয়ারণ্য, জলমহাল, মুক্ত জলাশয় ও খাল-বিলের মাছ অবাধে লুটে নিয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিকরা প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার মৎস্য বাণিজ্য করে যাচ্ছেন কোনো বাছ-বিচার না করেই। এ ছাড়া জেলে ও সৌখিন মৎস্য শিকারিরা প্রতিদিন প্রকাশ্যে বিভিন্ন ধরনের জাল ফেলে ডিমওয়ালা মা ও রেণু পোনা নিধন করে চলেছে। অবাধে ডিমওয়ালা মা ও পোনামাছ নিধনের ফলে দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ বিলুুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রায় প্রতি বছর জলমহালের দখল ও মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘাত ও সংঘর্ষ লেগেই থাকে। জলমহালে বরাবরই সরকারদলীয়রা একচ্ছত্র সুবিধা ভোগ করে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন। প্রতিবাদ করতে গেলেই ওই সব সুবিধাভোগী রাজনীতিকদের কোপানলে পড়তে হয় প্রতিবাদকারীদের। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও তাদের ঘাটাতে সাহস পান না। নামমাত্র মূল্যে জলমহাল লিজ দেয়ায় সরকার প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
৮২টি ছোট-বড় হাওরসহ বেশ কয়েকটি মৎস্য অভয়ারণ্য এবং অসংখ্য খাল-বিল, নদী-নালা রয়েছে এ জেলায়। বছরের প্রায় ৬ মাস হাওরাঞ্চল থাকে পানিতে পূর্ণ। ১৯৮৫ সালে প্রণীত মৎস্য আইনে ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পাঁচ মাস ১২ ইঞ্চির নিচে মাছ ধরা এবং বিক্রি করা নিষিদ্ধ করা হলেও তা কেউ মানছে না। একশ্রেণীর জেলে ও সৌখিন মৎস্য শিকারি মাছের প্রজনন মওসুমে অবাধে ডিমওয়ালা মা ও রেণু পোনা নিধন করে থাকে। মৎস্য সংরক্ষণ আইনের যথাযথ নিষিদ্ধ ঘোষিত কারেন্ট ও মশারি জাল দিয়ে অবাধে রেণু পোনা ও ডিমওয়ালা মা মাছ নিধন করে চলেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের তৎপরতা না থাকায় ও উদাসীনতায় চলতি মওসুমে বিগত বছরের  চেয়ে অধিকহারে ডিমওয়ালা মা ও রেণু পোনা নিধন চলছে। ফলে দেশীয় প্রজাতির ভেদা, ভেটকি, চান্দা, টাকি, পুঁটি, শিং, মাগুর, কৈ, কাজলী, গুতুম, পাবদা, বাউস, চিতল, আইর, বাইন, বানহারি, বাগাইর, শোল, গজারসহ আরো নানা প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ফসলি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার প্রয়োগের কারণেও এসব দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশ বিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর দেশীয় সুস্বাদু এসব মাছের জায়গা পূরণ করা হচ্ছে চাষকৃত মাছ দিয়ে, যা মোটেও প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা দেশীয় প্রজাতির মাছের সাথে কোনোক্রমেই তুলনীয় নয়। 
নেত্রকোনার সুস্বাদু দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ প্রতিদিন ট্রেন ও ট্রাকে করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও এ মাছ রফতানি হয়ে আসছে। এক দুর্লভ মাছের নাম মহাশোল। অত্যন্ত সুস্বাদু এ মাছ কেবল বর্ষাকালে জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা দুর্গাপুরের খরাস্রোতা সোমেশ্বরী নদীতেই পাওয়া যায়। তবুও আবার আকস্মিকভাবে হাতেগোনা কয়েকটি মাছ বর্ষা মওসুমেই পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইলিশকে যেমন মাছের রাজা বলা হয়ে থাকে, ঠিক তেমনিভাবে মহাশোলকে বলা হয় মাছের সম্র্রাট।
 জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, একশ্রেণীর জেলে ও সৌখিন মৎস্য শিকারি নিষিদ্ধ ঘোষিত কারেন্ট জাল, মশারি জাল ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে রেণু পোনা ও ডিম সংগ্রহে নেমে পড়েছে। বোয়াল, আইর, কালিবাউস, বাইম, শোল, গজারের পোনামাছ ধরতে গিয়ে নির্বিচারে তারা অন্যান্য রেণু পোনা ও ডিম ধ্বংস করছে। মাঝে মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে কারেন্ট ও মশারি জালে মাছ ধরা বন্ধ করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হলেও বর্তমানে তার  কার্যকারিতা নেই। অফিস চলাকালীন গিয়েও মৎস্য কর্মকর্তাদের বেশির ভাগ সময়ই পাওয় যায় না। ফলে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মৎস্যচাষিরা পরামর্শের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়েও কর্মকর্তাদের না পেয়ে বিমুখ হয়ে ফিরে আসেন।
মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপুতা হাওরপাড়ের মৎস্যচাষি কেরামত মওলা বলেন, ‘বর্ষা লাগনের আগেই এইখানকার আড়তদাররা হাওরপাড়ের জাইলাদেরকে চড়া সুদে ট্যাহা দিয়া হেরারে আড়তে মাছ দেওনের লাইগ্যা বাধ্য করাইন। সুদের ট্যাহা ফেরত দিতেই তো হক্কলে হাওর বাওর খাল বিল ও খোলা জায়গায় বাছবিচার না কইর‌্যাই তো মাছ ধরে।’ 
 নেত্রকোনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম জানান, প্রজনন মওসুমে ডিমওয়ালা মা ও রেণু পোনা ধরা থেকে জেলেদের বিরত রাখতে হাওরাঞ্চলে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু সচেতনার অভাব ও সাময়িক লাভের আশায় বেশির ভাগ মৎস্য শিকারি তা আমলে না নেয়ায় সব কার্যক্রমই বিফলে যায়।

Share with :

Facebook Twitter